Home » পশ্চিমবঙ্গ » রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের স্কুল বন্ধ করতে গিয়ে আইনি ধাক্কা খেল মমতা সরকার

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের স্কুল বন্ধ করতে গিয়ে আইনি ধাক্কা খেল মমতা সরকার

কলকাতা: সংঘের স্কুল বন্ধ করতে গিয়ে আদালতে বিপাকে পড়ল রাজ্য সরকার। আদালতের নির্দেশ ছাড়া সংঘ পরিচালিত স্কুলগুলি রাজ্য বন্ধ করতে পারবে না বলে জানিয়ে দিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়।
রাজ্যে সংঘের প্রসার ঠেকাতে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার স্কুলগুলি বন্ধ করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় সংঘ পরিচালিত স্কুলের বিরুদ্ধে মুখ খোলার পরেই উত্তর দিনাজপুর জেলার ডিস্ট্রিক্ট ইনস্পেক্টর স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আদালতে এমনই অভিযোগ করেছেন স্কুল কমিটির আইনজীবী লোকনাথ চট্টোপাধ্যায়।
মাস কয়েক আগেই রাজ্যের কাছে রিপোর্ট এসেছিল, প্রায় প্রতিটি জেলায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংঘের কার্যকলাপের পরিধিও বেড়েছে। এই তথ্য রাজ্যের শাসক দলের কপালে ভাঁজ ফেলে দেয়। বকলমে আরএসএস নিয়ন্ত্রিত বিদ্যালয়গুলির বাড়বাড়ন্ত নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি স্বীকার করে নেয় রাজ্য প্রশাসন। বিষয়টি এতটাই স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে যে গত ৯ মার্চ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীকে বিধানসভা অধিবেশন কক্ষে দু’দফায় এসে এ ব্যাপারে বিবৃতি দিতে হয়।
ওই দিন কামারহাটির সিপিএম বিধায়ক মানস মুখোপাধ্যায় প্রশ্ন করেন, সরস্বতী শিশুমন্দির নামে কোনও বিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি? সারদা বিদ্যামন্দির নামে কোনও বিদ্যালয় কি সরকার থেকে অনুমোদন পেয়েছে? উত্তর দিতে উঠে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, সরস্বতী শিশুমন্দির নামে কোনও স্কুলের অনুমোদন নেই। তবে সারদা বিদ্যামন্দির নামে পাঁচটি স্কুল অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে দু’টি করে রয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুর এবং উত্তর দিনাজপুরে। একটি রয়েছে মুর্শিদাবাদে।
এর পরই অতিরিক্ত প্রশ্ন করতে উঠে মানসবাবু বলেন, বিবেকানন্দ বিদ্যাবিকাশ পরিষদ নামে একটি ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, তাদের অধীনে ৩০০টি বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অনুমোদন রয়েছে ২৫টির। দু’টি মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয়ও রয়েছে। ৩০০টি বিদ্যালয়ে মোট পড়ুয়ার সংখ্যা ৬০ হাজার ৫৪৫ জন। প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে এই বিদ্যালয়গুলি খোলা হয়েছে। নির্দিষ্ট জাতি ও সম্প্রদায়ের উপরে এই বিদ্যালয়গুলির পড়াশুনার পরিকাঠামো যথেষ্ট প্রভাব ফেলছে। শিশুমনকে বিভ্রান্ত করছে। সরকারিসিলেবাসের বাইরে গিয়ে এই বিদ্যালয়গুলিতে পঠন-পাঠন হচ্ছে। মূলত ধর্মকে গুরুত্ব দিয়ে পড়াশুনা করানো হচ্ছে। পালটা বলতে উঠে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ওয়েবসাইটে যা দেওয়া থাকে, তা সর্বদা সত্য নয়। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি তাঁদেরও নজরে এসেছে। ইতিমধ্যেই শ’খানেক বিদ্যালয়ের কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীও একটি বিদ্যালয়ের নাম বলেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, রাজ্য সরকার কেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করছে না? কেন এই অনুমোদনহীন বিদ্যালয়গুলিকে দিনের পর দিন চলতে দেওয়া হচ্ছে?
রাজ্য সরকারের ওই মনোভাবকে কটাক্ষ করে বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, গত পাঁচ বছরে আরএসএসের শাখার কার্যপরিধি বেড়েছে। ওই শাখাগুলির নিয়ন্ত্রণে থাকা বিদ্যালয়গুলি অনুমোদন পেয়েই রাজ্যজুড়ে বিস্তারলাভ করেছে। যতই প্রকাশ্যে বিরোধিতা করুক না কেন, তলে তলে মোদিভাই-দিদিভাইয়ের যে যোগসূত্র রয়েছে, তা তো প্রথম থেকেই আমরা দাবি করে আসছি।
প্রথম ধাপে শিক্ষামন্ত্রী সরাসরি না বললেও, পরের ধাপে বলেন, আরএসএস স্কুল চালাচ্ছে এমন খবর দিলে তিনি বন্ধ করে দেবেন। এ ব্যাপারে বাম আমলের দিকে বল ঠেলে দিয়ে তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলেই এই ধরনের বিদ্যালয় বেশি অনুমোদন পেয়েছে। তাঁদের আমলে কম হয়েছে। তবে এ ধরনের সিংহভাগ বিদ্যালয়ই কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন পেয়ে রাজ্যের কাছে আবেদন করে। পড়াশুনায় ধর্মকে ব্যবহার করা নিয়ে তিনি বলেন, সরকারের সিলেবাসের বাইরে গিয়ে অন্য পাঠ্যক্রম পড়ানো কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা চলছে। কোনওরকম ধর্মান্ধতা বিদ্যালয়ে বরদাস্ত করা হবে না।
পরে সাংবাদিক বৈঠকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা খড়্গপুরের বিধায়ক দিলীপ ঘোষ বলেন, আরএসএস-এর একটি শাখা যাবতীয় অনুমোদন নিয়ে এই বিদ্যালয়গুলি চালাচ্ছে। এই বিদ্যালয়গুলির বদলে রাজ্যের উচিত মাদ্রাসাগুলিতে নজর দেওয়া। কারণ সেখানে তো মহাপুরুষদের জীবনীও পড়ানো হয় না।
উত্তর দিনাজপুর জেলার ডিস্ট্রিক্ট ইনস্পেক্টর নির্দেশ দিয়েছিলেন, পরিকাঠামোর অভাব এবং প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের অনুমোদন ছাড়াই চলছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ কর্তৃক পরিচালিত স্কুলগুলি। অবিলম্বে সেগুলি বন্ধ হওয়া উচিত। সেই নির্দেশ মতো বন্ধ হয়ে যায় ওই জেলায় সংঘ পরিচালিত ১০টি স্কুল।
সংঘের সংস্থা উত্তরবঙ্গ সারদা ট্রাস্টের অধীনে উত্তর দিনাজপুর জেলায় মোট ১০টি স্কুল চলে। যার মধ্যে রয়েছে ‘সারদা শিশুতীর্থ’ স্কুল। চলতি বছরের মার্চ মাসের চার তারিখে ডিস্ট্রিক্ট ইনস্পেক্টর স্কুল বন্ধের বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। সেই নির্দেশ কার্যকর হওয়ার পর সেই দশটি স্কুলে একত্রিত হয়ে মামলা করে কলকাতা হাইকোর্টে। স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, বিগত ১০ বছর ধরে স্কুলগুলি চলছে।
১২ মে ডিস্ট্রিক্ট ইনস্পেক্টরের জারি করা বিজ্ঞপ্তির উপরে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেন কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ফের মামলা করে রাজ্য সরকার। বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্য্যের বেঞ্চে ওঠে সেই মামলা। আদালতে কেন্দ্রের আইনজীবী অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেল কৌশিক চন্দ্র বলেন, “শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার, তাই এটা কেউ খর্ব করতে পারে না।” উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর রায় দান স্থগিত রাখেন বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়। একই সঙ্গে তিনি জানিয়ে দেন যে যতদিন না পর্যন্ত রায়দান হচ্ছে ততদিন স্কুল বন্ধ করতে পারবে না রাজ্য।

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মাজুলিতে ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষে পৰ্যটন প্ৰকল্পের শিলান্যাস সর্বানন্দ সনোয়ালের

মাজুলি: পৰ্যটন শিল্পের পরিকাঠামো উন্নয়নে মাজুলিতে ‘ঐতিহ্যমণ্ডিত স্বদেশ দৰ্শন’ প্রকল্পের শিলান্যাস করেছেন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। ...