আমি একসময় বামপন্থীদের সমর্থন করছিলাম, তাদের পচন দেখে পরিত্যাগ করেছি: সুবোধ সরকার

সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের বেতাজ বাতসা, একসময় তিনি ছিলেন বামপন্থী সমর্থক। বর্তমানে তৃণমূল পন্থী হিসাবেই তিনি পরিচিত। বিতর্কিত কবি সুবোধ সরকার। তাঁর সাহিত্য ও রাজনৈতিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা জানালেন যুগশঙ্খ ডিজিটালকে।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: কীভাবে লেখার জগতে এলেন?

সুবোধ সরকার: তখন আমি কৃষ্ণনগরের ছাত্র। একদিন বিকেলে আমরা পাঁচ-ছয়জন বন্ধু কৃষ্ণনগর স্টেশনে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারছিলাম। কলকাতা থেকে ট্রেন ঢুকছে। ওই সময় একটা লোক ট্রেনের সামনে ঝাঁপ মারল। কিন্তু মারা যায়নি। ট্রেনটা চলে গেল, আমরা গিয়ে দেখলাম ওই লোকটা হাতে একটা পাউরুটির প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে একটা মৃত্যু থেকে ফিরে আসার হাসি। ওই হাসিটা আমাকে সাংঘাতিকভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল। সেই দিন রাতে বাড়ি ফিরে আমি আমার প্রথম কবিতা লিখি। আমার প্রথম কবিতা হারিয়ে গেছে কিন্তু ওই হাসিটা এখনও বেঁচে আছে। ওই হাসিটাই আমাকে গত চল্লিশ বছর ধরে লিখিয়ে আসছে।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: সাহিত্য আপনার জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

সুবোধ সরকার: সাহিত্য যে আমাকে খুব একটা প্রভাবিত করেছে তা নয়। ছোটবেলায় আমার জীবনে খুব একটা সাহিত্যের পরিবেশ ছিল না। আমার বাবা ছিলেন স্মরণার্থী। দুবেলা খাবার জোটানোটাই ছিল চিন্তা। এরকম পরিস্থিতিতে সাহিত্য নিয়ে ভাবাটাই অসম্ভব। কিন্তু কেমন করে যেন আমার উপরেই গান নেমে এলো এবং গানের মধ্যে দিয়ে কবিতার পথে হাঁটা শুরু।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: সাহিত্য একাডেমিতে থেকে তো আপনি বাংলা সাহিত্যের জন্য অনেক কিছুই করলেন। আগামীদিনে কী কী পরিকল্পনা আছে?

সুবোধ সরকার: দেখো করলেন বলা যাবে না। কারণ সবে একবছর তো হল আমি দাযিত্ব নিয়েছি। অনেক কাজই হচ্ছে, তার মধ্যে ছোট একটা কাজের কথা বলি। সাহিত্য একাডেমি তো অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। ভারতের সাহিত্যের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সাহিত্য একাডেমি। আমার মনে হয়েছে আমাদের গ্রামের প্রতিভা খুঁজতে হবে। সেই জন্য আমরা গ্রামালোক অনুষ্ঠান শুরু করেছি। এবং পশ্চিমবঙ্গের অনেক গ্রামে যেমন মেদিনীপুরের গ্রামে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গ্রামে, কিংবা বনগাঁয়, উত্তরবঙ্গের কোনও ছোট্ট একটা গ্রামে যদি পেঁছে যাই, এমনকী গেছে ইতিমধ্যে এবং আরও যাবে। এই গ্রামালোক অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে অনেক প্রত্যন্ত গ্রামের সাহিত্যিক এবং সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে আমরা যে পৌঁছতে পারছি সেটাতে আমি খুব আনন্দ পাচ্ছি।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: লোকে বলে বাংলা সাহিত্যের পাঠক সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে। এ বিষয়ে আপনার কী মনে হয়, বাংলা সাহিত্যে পাঠক সংখ্যা সত্যিই কি কমে যাচ্ছে?

সুবোধ সরকার: না, আমার সেরকম মনে হয় না। এখন বইমেলাগুলোতে যেরকম ভিড় হয়, বিশেষ করে আমাদের গর্বের কলকাতা বইমেলাতে যে ভিড়, তাতে তো একেবারে হাঁটাই যায় না। সেই ভিড় দেখে আর বই বিক্রির সংখ্যা দেখে আমার তো মনে হয় পাঠক কমছে না। এছাড়াও অন্যান্য প্রকাশনীগুলোর বই বিক্রির যে রেকর্ড সেগুলো দেখেও বোঝা যায় পাঠক কিন্তু কমছে না।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: আচ্ছা আপনি তো চল্লিশ বছর কবিতার সঙ্গে কাটিয়ে দিলেন। কবিতা লিখতে গিয়ে কখনও কোনও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন?

সুবোধ সরকার: প্রতিবন্ধকতা তো প্রতিদিনের সঙ্গী। প্রতিদিনই একটা না একটা বিরোধিতা, প্রতিবন্ধকতা সহ্য করতে হয়। অনেক তীর ছুটে আসে। প্রতিবন্ধকতা আছে। শুধু আমার নয় সব লেখকদেরই আছে।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: এক সময় মনে করা হতো তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের আঁতুড় ঘর লিটল ম্যাগাজিন। এখন এই প্রজন্মের কাছে লেখা প্রকাশের খুব সহজ মাধ্যম হল সোশ্যাল মিডিয়া। এরজন্য কি কোথাও লিটল ম্যাগাজিন মার খাচ্ছে?

সুবোধ সরকার: এখন তরুণ কবিরা অনেক বেশি আগ্রহী হয়েছেন ফেসবুকে। কিন্তু আমি মনে করি আসল জায়গা এখনও লিটল ম্যাগাজিন। ফেসবুকে তো কোনও এডিটর নেই, কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনে একজন এডিটর থাকে। সুতরাং ফেসবুকে যে এই আন-এডিটেড লেখা প্রকাশের প্রতিযোগিতা চলছে, সেটা হয়তো চলতেই থাকবে। কেউ কেউ তো বলছে লিটল ম্যাগাজিনের মৃত্যু ঘণ্টা বেজে গেছে। কিন্তু আমার মনে হয় ফেসবুক এবং লিটল ম্যাগাজিন দুটোই একসঙ্গে চলবে। আমাদের টেকনোলজি, আমাদের ম্যাচুরিটি হয়তো আমাদের সেই জায়গায় পৌঁছে দেবে।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এখন তো সকলেই প্রায় কবি। বরং পাঠক হাতে গোনা। সেদিক থেকে দেখতে গেলে লেখার মান কি পড়ে যাচ্ছে না? বিশেষ করে যাঁরা নতুন লিখছেন?

সুবোধ সরকার: আমি ঠিক এরকমটা ভাবি না। অনেক সময় এমন হয় যে নতুন একটা সময়কে বুঝে উঠতে একটু সময় লাগে। নতুন একটা দশক এসে আমাদের সামনে দাঁড়ায়। তখন তার নতুন লেখাগুলোকে আমরা সব সময় বুঝতে পারি তা নয়। এমনটা হয়, যে একটা নতুন দশকে একশ জন লিখতে আসেন, তাঁদের মধ্যে থেকে শেষমেশ দশজন উঠে আসেন। সেখান থেকেও হয়তো আরও সাতজন সরে গেল। এভাবেও সাহিত্য এগিয়ে চলে। আর এই ঘটনাটা যে শুধুমাত্র বাংলায় ঘটে তা নয়, সব ভাষাতেই এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: আচ্ছা এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি প্রথম শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন ধুপগুড়ির সুকান্ত মহাবিদ্যালয়ে। তারপর কলকাতার সিটি কলেজ। আপনার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের কোনও বিশেষ ঘটনা য়দি শেযার করেন আমাদের সঙ্গে

সুবোধ সরকার: হ্যাঁ, আমি তো আমার শিক্ষকতা জীবন শুরু করেছিলাম জলপাইগুড়ির ধুপগুড়ির কলেজ সুকান্ত মহাবিদ্যালয় থেকে। সেখানে আমি এগারো মাস পড়িয়েছিলাম। আর পরবর্তীতে তো কলকাতার সিটি কলেজেই আমার শিক্ষকতা জীবন কেটে গেছে এবং কাটছে। আর খুব সম্প্রতি আমেরিকার আয়োয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখক শিবির হয়ে গেল। যেখানে সারা পৃথিবীর লেখকরা আসেন। সেখানে সেই লেখক শিবিরে আমি অংশ নিয়েছি। এবং পাশাপাশি একটা সেমিস্টার জুড়ে সেখানে ছেলে-মেয়েদের পড়ানোর দায়িত্ব ছিল আমার ইংরেজি বিভাগে। সেই অভিজ্ঞতা আমার শিক্ষক জীবনের একটা বিশেষ দিক।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: সাহিত্যের জন্য আপনি দেশের বাইরে বহু জায়গায় গেছেন। সেখানে অনেক বিদেশি সাহিত্যিকদের সঙ্গে আপনার পরিচয় হয়েছে। এই জায়গা থেকে আমার প্রশ্ন সাহিত্যে অনুবাদ কতটা জরুরি?

সুবোধ সরকার: ভীষণ জরুরি। অনুবাদ ছাড়া আমরা অন্ধ। অনুবাদ করতে হবে। য়ে ভাষায় অনুবাদ হয় না, সেই ভাষার কবি-লেখকরা অন্ধ হয়ে জীবন-যাপন করেন। বাংলা ভাষায় অনুবাদের একটা বিরাট ঐতিহ্য আছে। বাংলা ভাষা ইংরেজি স্প্যানিস বিভিন্ন  ভাষা থেকে যেভাবে নিয়েছে তেমন অন্য ভাষাকে দিয়েছেও। যে  কোনও ভাষার সাহিত্যকে বেঁচে থাকতে হলে, আরেকটি ভাষায় কী লেখা হচ্ছে সেটা জানতে হবে।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট সুবোধ সরকার একথা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। কিন্তু আপনি যখন তরুণ লেখক ছিলেন তখন এমন কেউ কি আপনাকে আটকানোর চেষ্টা করেছে?

সুবোধ সরকার: আমাকে আটকানোর চেষ্টা করেছে এটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। আমার কাছে অনেক বেশি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, যে কবি বা যে লেখক সেই আটকানোটাকে টপকে যায় এবং একবার না বারবার টপকে যায় তাঁর প্রতিভার জোরে, তাঁর ক্ষমতার জোরে, তাঁর বুদ্ধির জোরে আমি তাঁকেই মান্যতা দিই।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, ওল্ড ওযাইন ইন অ্যা নিউ বটল সেদিক থেকে দেখলে এই প্রজন্মের উঠতি লেখকরা প্রবীণ লেখকদের কনসেপ্টকেই কি কপি করছে না?

সুবোধ সরকার: নতুন লেখার সঙ্গে পুরনো লেখার নিশ্চয়ই তফাত আছে। নতুন যে  লেখকরা তাঁদের জন্মই হয়েছে অনেক পরে। সুতরাং তাঁদের ভাবনাচিন্তার মধ্যে পরিবর্তন তো আসবেই। নতুন ভাবনাচিন্তা থাকলে লেখাও নতুন হয়ে ওঠে। আর নতুন ভাবনাচিন্তা না থাকলে একজন তরুণ লেখক দাঁড়াতেই পারবে না। শুধুমাত্র পুরনো লেখাকে কপি করে গেলে সে হারিয়ে যাবে।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: আপানর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমাদের যদি কিছু বলেন…

সুবোধ সরকার: আমার রাজনৈতিক জীবন বলে তো কিছু হতে পারে না। কারণ আমি তো সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নই। আমি সমর্থক। আমি তো আর ভোটে দাঁড়াইনি। মানে কোনও প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে তো আমি প্রবেশ করিনি। তাই আমার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই।

আমি একসময় বামপন্থীদের সমর্থন করছিলাম, তাদের পচন দেখে পরিত্যাগ করেছি। আমি এখন ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি আসল কাজটা পশ্চিমবঙ্গে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেছেন। গরিব মানুষদের কাছে চাল পেঁছে দিয়েেন, সাইকেল পেঁছে দিয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এই যে তিনি গরিব মানুষদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন এটা তাঁদের পঁয়ত্রিশ বছরে করা উচিত ছিল, কিন্তু ওরা সেটা করেনি। একটা অত্যন্ত মানবিক দিক যেটা আমাকে ভাবায় যে এই যে গ্রামে-গঞ্জে, রাস্তা-ঘাটে, নদীর ধারে য়ে শিল্পীরা অবহেলিত হয়ে পড়েছিল, বাউল গান গাইছে, ভাটিয়ালি গান গাইছে, কেউ তবলা বাজাচ্ছে, কেউ ঝুমুর শিল্পী- উনি এই সমস্ত শিল্পীদের নিয়ে এসেছেন এবং তাঁদের হাতে যাতে একটু পয়সা আসে তার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি কন্যাশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমেও সারা পৃথিবীতে একটা মডেল তৈরি করেছেন।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: সাহিত্য জীবনে এমন কোনও ঘটনা যেটা আপনাকে খুব প্রভাবিত করেছে…

সুবোধ সরকার: আমার সমস্ত লেখাই দাঁড়িয়ে রয়েছে কোনও না কোনও ঘটনার ওপর। সেই ঘটনা যদি আমাকে প্রভাবিত না করে তাহলে আমি লিখতে পারি না। ২০০১ সালে গুজরাত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, প্রায় সবগুলো ঘটনাতেই আমার লেখা আছে। সুতরাং সেই অর্থে ঘটনা না ঘটলে তো আমি লিখতামই না। কালকে থেকে যদি খারাপ ঘটনা না ঘটে আমি লেখা ছেড়ে দেব।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: কারও প্রতি কোনও ক্ষোভ বা অভিযোগ আছে আপনার?

সুবোধ সরকার: নিজের ওপর আছে। আমি এমন এমন মানুষকে বিশ্বাস করেছি যে পরে ঠকেছি। এমন এমন কবি-লেখককে আমি চিনি যাঁরা বিশ্বাসের যোগ্য নয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করেছি। আমি একথাও বলব যে আমি কালকেও আবার বিশ্বাস করব। ঠকে যেতে পারি এটা জেনেও আমি বিশ্বাস করব।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: তরুণ কবিদের উদ্দেশ্যে আপনি কী বলতে চান?

সুবোধ সরকার: তরুণ কবিদের লেখা আমি সবসময় আগ্রহের সঙ্গে পড়ি। কে কোথায় লিখছে সেটা নজর রাখার চেষ্টা করি। এবং তাতে আমি নিজেই উপকৃত হই। নতুনদের লেখা, নতুন আগুনের স্পর্শ, নতুন নদীর জলের শস্য, নতুন ঝড়ের আভাস, নতুন লণ্ডভণ্ড এগুলো তো সবসময় ভালো লাগে। যাঁরা ভাষা নিয়ে কাজ করেন, যাঁরা ভাষার মধ্যে থাকেন, তাঁরা সবসময় চান, ভাষাটা সৃজনশীল হয়ে উঠুক। ভাষা যদি তার সৃজনটা হারিয়ে ফেলে তাহলে তো ভাষাটা মারা যায়। নতুনদের লেখার মধ্যে যে নতুন সৃজনশীলতা তার দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়।

Spread the love

1 comment on “আমি একসময় বামপন্থীদের সমর্থন করছিলাম, তাদের পচন দেখে পরিত্যাগ করেছি: সুবোধ সরকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *