সুর কীভাবে এক করে দেয় ধর্ম ও রাষ্ট্রকে

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক | April 15, 2019 | 3:47 pm

সম্রাট গোস্বামী

গানের চিন্তা মাথায় এলে সবসময়ই যে হারমোনিয়াম, তানপুরা, পিয়ানো, গিটার নিয়ে বসতে হবে, এমন নয়; মাঝে-মধ্যে একটু খাতা-কলম নিয়েও বসতে হয় বৈকি। আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির তিন ছেলে গান, নাটক আর ছবি’র মধ্যে একটা জিনিসে বড় মিল। এগুলোর খসড়া খাতার পাতায় হয় বটে (গানের ক্ষেত্রে লিরিক, নাটকের ক্ষেত্রে স্ক্রিপ্ট আর ছবির ক্ষেত্রে লে-আউট ), তবে তার প্রয়োগটা হয় আলাদা। অর্থাৎ, এই তিনটিরই দুটো অংশ— তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক।

আর একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, এই দুটো অংশ কিন্তু একে অপরের পরিপূরক। কাজেই দুইয়ের ব্যবহারের ক্ষেত্রেই সংযম দরকার। কেবল একতরফা চর্চা উচিত নয়।

গানের ব্যবহারিক অংশটার চর্চার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে একটু কথা বলারও প্রয়োজন পড়ে। তাকে কেউ তত্ত্ব বললে বলতে পারে, তবে প্রকৃতপক্ষে গান পরিবেশনের ওই হল খসড়াটা।

যাই হোক, যেটা বলব, গানের ক্ষেত্রে সুরগত মিল নিয়ে কিছু মজার কথা। অর্থাৎ, আলাদা আলাদা গানে সুরের মিল। এই সুরগত মিল প্রধানত তিনভাবে হয়। আমরা জানি, এক সুরে অনেক সময় একাধিক গান গাওয়া হয়। যেমন একটা খুব পরিচিত উদাহরণ – “মনে পড়ে রুবি রায়” ও “মেরি ভিগি ভিগি সি” দুটো গানের সুরের মিল। এরকম উদাহরণ অজস্র। এক্ষেত্রে দুটো গানের সুর সম্পূর্ণ এক হয়। এই হল প্রথম ধরণ। দ্বিতীয়ত, অনেকসময় একটা গানের সুর সামান্য পরিবর্তিত করে অন্য একটা গানের সুর নির্মাণ করা হয়। যেমন, নজরুল গীতি “অরুণকান্তি কে গো”-এর সুরে “পুছোনা ক্যায়সে”। সুরটা প্রায় এক, তবে মান্না দে’র কন্ঠে জনপ্রিয় হিন্দি গানটিতে সঞ্চারী অংশের সুরটা বাদ পড়েছে। আর একটা মজার উদাহরণ আছে। “দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা” গানটা আমরা সবাই শুনেছি। শ্যামল মিত্র ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় অসাধারণ গেয়েছিলেন। কিন্তু এর সাথে সুরের আশ্চর্য মিল রয়েছে তার বহুপূর্বে তৈরি কমল দাশগুপ্তের সুর করা একটি গানের “দোলে পিয়াল শাখে ঝুলনা।” এক্ষেত্রে সুরটা সম্পূর্ণত এক থাকছে না, একটু পরিবর্তিত হচ্ছে, অর্থাৎ প্রথমটির থেকে এখানে সুরগত মিল একটু সূক্ষ্ম। তৃতীয়ত, অনেক সময় দেখা যায়, দুটো গানের মধ্যে খুবই সূক্ষ্ম সুরগত মিল রয়েছে, গানের রাগ-রাগিনী ও চরণের মিলের কারণে এমনটা হয়ে থাকে। এই সুরগত মিল অতীব সূক্ষ্ম, সাধারণ কানে সবসময় তা ধরা পড়ে না।

শেষোক্ত যে কথাটা বললাম, অর্থাৎ গানের সূক্ষ্ম সুরগত মিল, এই বিষয়টা এতটাই ইন্টেরেস্টিং, যে এ নিয়ে আস্ত একটা বই লেখা চলে। এই বিষয়টায় ভয়ংকর সব উদাহরণ রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো এমনই যে তলিয়ে দেখলে অবাক হতে হয়।

এতটা গৌরচন্দ্রিকা শেষে বরং এরকমই সুরের মিল নিয়ে তিনটে গল্প শোনাই।

[ ২ ]

বেশ কয়েক বছর আগে একদিন সন্ধ্যেবেলা কাজের সূত্রে গিয়েছিলাম রামকৃষ্ণ মিশনে। দেখলাম ঈশোপনিষদের ব্যাখ্যা চলছে। সঙ্গে গানও। প্রতিটি উপনিষদের শুরুতে একটা শান্তিপাঠ থাকে। ঈশোপনিষদের শান্তিপাঠটি প্রথমে একজন মহারাজ গাইলেন ও তারপরে অন্য একজন সেটি উচ্চারণ করে বাংলায় ব্যাখ্যা করলেন—

“ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।”

উদাত্ত স্বরে মহারাজ মন্ত্রটিকে যে সুরে গাইলেন, তা শুনে বুঝলাম, রাগের কম্পোজিশনটা আহির ভৈরবের।

ঘটনাটা মাথায় ছিল অনেকদিন। তারপর অবচেতনে চলে যায়। হঠাৎ কয়েক মাস আগে ক্লাসিকাল শিল্পী পন্ডিত নীরজ পারিখের একটা অনুষ্ঠান দেখলাম। তিনি আহির ভৈরব নিয়ে আলোচনা করছেন এবং বিভিন্ন বন্দিশ পরিবেশন করছেন। তিনি বললেন, আহির ভৈরবের মূল রস ভক্তিরস এবং তারপরেই পূর্বোক্ত ঈশোপনিষদের শান্তিপাঠের সেই মন্ত্রটি আহির ভৈরবের কাঠামোয় শোনালেন। ঠিক যেমনটা আমি শুনেছিলাম মিশনে মহারাজের কন্ঠে।

এরপরে নীরজজি দেখালেন, কিভাবে এই একই রাগে ইসলামের কথাও পরিবেশন করা হয়। গেয়ে শোনালেন খুব সম্ভবত ফরজ নমাজের এই তাকবীরটি “আল্লাহু আকবর লা ইলাহা ইল্লাহু”।

আমি দেখলাম রাগের সাথে সুরগত মিলের সূক্ষতায় কিভাবে এক হয়ে গেল ঔপনিষদিক মন্ত্র আর ইসলামীয় তাকবীর। শঙ্খ আর আজান যেন বেজে উঠল একসাথে। মাধ্যম হয়ে গেল দুটো গানের সুরগত মিল।

[ ৩ ]

সুরগত মিল যেমন দুই ধর্মকে এক করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, তেমনই এক করে দেয় দুটো পরস্পরবিরোধী দেশকেও। কীভাবে? বলি তাহলে।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাক যুদ্ধের সময় দেশপ্রেম জাগরণে ভারতে একটি গান তৈরি হয় — “জননী তেরি জয় হ্যায়”। গানটির সুর করেছিলেন আচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। সমবেত কন্ঠে গাওয়া হয়েছিল।

ওই একই সময় পাকিস্তানও একটি দেশাত্মবোধক গান তৈরি করে — “অ্যায় বতন কে সজিলে জাওয়ানোঁ/ ইয়ে নাগমে তুমহারে লিঁয়ে হ্যায়”। গেয়েছিলেন প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী নুরজাহান।

দুটো গানে অনেক পার্থক্য ছিল। ভারতের গানটা গাওয়া হয়েছিল সমবেত কন্ঠে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে কন্ঠটা একক। ভারতের গানটার তাল ছিল আট মাত্রার, কাহারবা তালে। পাকিস্তানের গানটা ছিল ছয় মাত্রার, দাদরা তালে। ভারতের দেশাত্মবোধক গানটা ছিল অ্যাগ্রেসিভ ভঙ্গিতে গাওয়া। অন্যদিকে পাকিস্তানের গানটা ছিল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে খুব কোমল ভঙ্গিতে তৈরি। শিল্পী নুরজাহান অসাধারণ গেয়েছিলেন।

এত পার্থক্য সত্ত্বেও দুটো গানকে মিলিয়ে দিয়েছিল একটি বিষয়। যুদ্ধরত পরস্পরবিরোধী দুটি দেশে দেশপ্রেম জাগরণে এবং একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যে দুটো গান লেখা হল, সেই দুটোই তৈরি হয়েছিল উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র তৈরি মাজ খাম্বাজ রাগে। সুরের সূক্ষ্ম মিলে কোথাও যেন এক হয়ে গিয়েছিল পরস্পর যুদ্ধরত দুটো দেশ।

[ ৪ ]

কেবল ধর্ম ও দেশ না। সুর মিলিয়ে দেয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকেও। এর উদাহরণ আমরা পেয়েছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, দিলীপ কুমার রায় থেকে শুরু করে সলিল চৌধুরী, এস. ডি. বর্মণ, আর. ডি. বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, গৌতম চট্টোপাধ্যায়, কবীর সুমন, রুপম ইসলাম, অনুপম রায়ের গানে। কিন্তু উক্ত সব ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সুর এসে প্রবেশ করেছে ভারতীয় সুরে। এর বিপরীতটাও লক্ষ্যণীয়। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর প্রভাব ফেলেছে মোৎসার্টের সুরে, রবিশংকর প্রভাব ফেলেছেন ইহুদি মেনিহিন, ফিলিপ গ্লাস এবং বিশ্বখ্যাত বীটলস-এর সুরে। অর্থাৎ, প্রাচ্য সুর গিয়ে হাত ধরেছে পাশ্চাত্যের।

এরকম অনুপ্রেরণা তো আছেই। কিন্তু সুরগত ক্ষেত্রে অনেক সময় অজান্তেই জড়িয়ে পড়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য। ভাল লাগা বা অসাধারণত্বের জায়গা থেকে নয়, এমনও হয়েছে, কেউ কোনোদিনও কারোর সুর না শুনেই সুরের মিল ঘটিয়ে ফেলেছে। অজান্তেই। একদম শেষে এরকম একটা উদাহরণই দেব।

পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুজন গীতিকার ও সুরকার — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বব ডিলান। দুজনেই তাদের গানের লিরিকের জন্য নোবেল পেয়েছেন। দুজনেই প্রভাবিত করেছেন বিশ্বকে। এবং উল্লেখযোগ্য এই যে, দুজনের গানে সুরও সূক্ষ্মভাবে এক হয়ে গেছে অজান্তেই।

রবীন্দ্রনাথের “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ” গানটা আমরা সবাই শুনেছি। কীর্তনাঙ্গের গান, পূজা পর্যায়ের। বব ডিলানের “Blowin’ in the Wind” গানটাও সবার জানা। ভাল করে শুনলে কিংবা বলা ভাল গাইলে দেখতে পাব দুটো গানে সুরের কি আশ্চর্য মিল। এই মিলটা তথাকথিত মিল নয়, বরং একে মিল না বললে পার্থক্যহীন বললে অধিক সংগত হবে। অর্থাৎ দুটো গানের যে কোনো অংশ একসাথে পরপর গাইলে মনে হবে না আলাদা আলাদা গান বলে। Blowin’ in the Wind” গাইতে গাইতে রবীন্দ্রনাথের গানের স্থায়ী আর সঞ্চারী অংশটা এমনিই চলে আসে, সুরগত বিন্যাসে মিলের কারণে। অথচ এই মিলটা কিন্তু ভেবেচিন্তে নয়, এসে পড়েছে আকস্মিকভাবেই এবং দুজন সুরকারের অজান্তেই।

এ পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল। মজার ব্যাপার হল, সুরের মিলনটা ঘটছে “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ” আর “How many roads must a man walk down before you call him a man?” কথাদুটোয়। একজন পথ চলার আনন্দে উচ্ছ্বসিত। আর একজন প্রশ্ন করছে, কতটা পথ চললে তবে মানুষ হওয়া যায়। একজন বেহিসেবী, পথ চলতেই তার আনন্দ। আর একজন চলার আগে জানতে চাইছে। এমনটা নয় যে সে চলতে চায় না। সে আসলে বাস্তবের চাপে বিপর্যস্ত। তাই সে চলার আগে হিসেব করে নিচ্ছে। অন্যজন কীর্তনের সুরে বাস্তব ভুলে গেছে, সে মজে তার ভাবের জগতে।

ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাব, ১৯৬৩ সালের কিছু আগে বব ডিলান এই গানটা লিখছেন, তিনি যুদ্ধ ও শান্তি, রাষ্ট্র ও নৈরাজ্য — সমস্তের বিরূদ্ধে প্রতিবাদী প্রশ্ন তুলছেন। তিনি এখানে ঘোরতর বাস্তববাদী, তাঁর আঙ্গিকে কাব্য ও সুর।

অন্যদিকে শিলাইদহে বসে রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালে এই গান লিখছেন। তিনি প্রকৃতির আনন্দে তখন মজে। তাঁর ভাববাদী সত্তা এই গানটা লিখতে তাঁকে প্রবৃত্ত করছে।

অথচ এই দুটো আপাত পরস্পরবিরোধী ভাবনা কোথাও যেন এক হয়ে গেছে সুরের বিন্যাসে এসে।

[ ৫ ]

গানের ক্ষেত্রে সুরগত মিলের এই সূক্ষ্ম হিসেবটা এতটাই ইন্টরেস্টিং যে এ নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করা যায়। এখানে তো মাত্র তিনটে উদাহরণ দিলাম, কিন্তু পৃথিবীর যাবতীয় গান বিশ্লেষণ করলে এরকম কাঁটা দেওয়ার মত উদাহরণ পাওয়া যাবে অজস্র, যাদের কিছু আবিষ্কৃত, বেশিরভাগটাই অনাবিষ্কৃত।

আবার এই বিষয়ে একটা প্রবন্ধে কোনো কিছু লেখা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ সুর নিয়ে আলোচনা করতে গেলে পাঠককে শ্রোতা হতে হয়। একইভাবে লেখককে হতে হয় গায়ক। আলোচনার মাধ্যমটা হতে হয় গান। কাজেই পুরো বিষয়টাকে অক্ষরে ধরানো বড়ই মুশকিল।

গানের খনি যে কত মণি-মাণিক্যে ভরা, এবং তা যে কাকতালীয়ভাবে কতরকম বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, এখানে আলোচিত হল তার একটা ছোট্ট কণা।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *