প্রসঙ্গ: ভোটকর্মীর ভয়

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক | April 15, 2019 | 3:29 pm

সুব্রত বিশ্বাস

ডেভিড বিথাম ও কেভিন বয়েল-এর লেখা ‘গণতন্ত্র’ নামক পুস্তিকায় গণতন্ত্রের সাধারণ ধারণা থেকে সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব, প্রত্যক্ষ বা বিকল্প ভোট প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি নির্বাচনী দুষ্কর্ম পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অথচ নাগরিকদের প্রদত্ত ভোটদান পর্ব সুষ্ঠু ও সাফল্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রে যে প্রত্যক্ষ অপরিহার্য ভোটকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তা থাকে, তার উল্লেখ ঐ পুস্তিকার কোথাও লক্ষ্য করা যায় না। আর ভারতবর্ষ যে অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকা নয় তা কে না জানে।

বাবা সাহেব আম্বেদকর ১৯৪৯ সালের ২৫ নভেম্বর গণপরিষদে দাঁড়িয়ে সমগ্র ভারতীয় জাতিকে আশু কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে বলেছিলেন, ‘ We will have equality in politics and inequality in social and economic life. We must remove this contradiction at the earliest moment or else those who suffer from inequality will blow up the structure political democracy. ‘সে ছিল সাংবিধানিক প্রত্যাশা, আর জাতির ছড়ানো ছিটানো রাজনৈতিক বোধ ও পরিস্থিতির সামনে একটা সচেতন প্রতিশ্রুতি এবং অঙ্গীকার। কিন্তু বৃহত্তর ভারতবাসী গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের বুনিয়াদ তৈরিতে অপ্রস্তুত ছিল না। তবু বৈষম্য আর দূর হলো কোথায়? ১৯৪৯ থেকে ২০১৯ সত্তর বছরের অভিজ্ঞতা একটু একটু করে social এবং economic life এর inequality তো দূর অস্ত, equality in politics-এর সূত্রধারা খুঁজে পেলো না সাধারণ ভারত। সেখানে ক্ষমতা গুরু রাজনৈতিক দল আর ক্ষমতাহীন বিরোধীর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সর্বক্ষণ লেগে আছে ভীতি, দখল, খুন, মামলা প্রভৃতির অনুষঙ্গে। গণতন্ত্রের আসল প্রতিযোগিতা যে গণনির্বাচন প্রক্রিয়া, সেখানে সেই শুরুর দিন থেকে যারা প্রথম ও প্রত্যক্ষ নিরপেক্ষ সঞ্চালক এক কথায় তারা নির্বাচন কমিশন কতৃক নিয়োগ করা তথাকথিত ভোটকর্মী। মূলত সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বেতনভূক কর্মচারী, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী প্রমুখ। যে কোনও স্তরের ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণত যারা বুথে বুথে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করেও শেষ পর্যন্ত জনসাধারণের ভোটপর্বটিকে সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনায় দায়বদ্ধ থাকেন। বলা বাহুল্য এই প্রত্যক্ষ ভোটকর্মীরাই সরাসরি জনগনের ভোটদান প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান সাক্ষী। অতএব তাদের অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া যে গণতন্ত্রের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তা ভুলে গেলে চলবে না।

এ দেশে ভোট নানা স্তরের , বৃহত্তর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে কথা। প্রত্যেকটি ভোট মরশুম এলেই মিডিয়া থেকে মাঠ সর্বত্র পৌঁছে যায় তার বাঁধভাঙা ঢেউ। সরকারি ক্ষমতার দল থেকে বিরোধী ওয়ান টু থ্রি ফোর টু ইনফিনিটি, তাবড় বক্তৃতা বিবৃতি থেকে শুরু করে পরস্পরের নিন্দা-মন্দে প্রত্যেকেই তৎপর। এদেশের সাধারণ ভোটার এখনও শুধুইমাত্র ভোটার, ইস্যু ভিত্তিক চিন্তা ভাবনা আর কোথায়! রাজনৈতিক চেতনা যে তাদের নিজস্ব– এই ধারণা ও বিশ্বাসের অবকাশ রাজনৈতিক পার্টিগুলো সাধারণকে সেভাবে আর দেয় কবে। ফলে কখনও ইস্তাহারে, কখনও যুক্তি ব্যতিরেকে প্রতিশ্রুতিতে কল্পতরু সেজে চেষ্টা চলতেই থাকে তোতা পড়ানোর কাজ। অন্যদিকে শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার গণ হার এ দেশে খাতাকলমেও আশ্বস্ত করার মতো অবস্থা অর্জন করতে আজও ব্যর্থ। ভোট দেবার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিনিধিকে জনপ্রতিনিধি হিসাবে বাছাইয়ে একটা বড়ো অংশ জনগন হয়তো কখনও অন্যের মতকেই নিজের মত বলে চালিয়ে দেন। কিন্তু সেই প্রভাবিত হওয়ার অধিকার জনগনের আছে। সেই জন্যই তো এতো এতো প্রচার বিজ্ঞাপন করে থাকে রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু তার বাইরে? যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের একটা অসৎ প্রচেষ্টা সমান্তরাল ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে? বুথজ্যাম, ছাপ্পা, ভয় দেখিয়ে ভোটকেন্দ্রে ভোটাধিকারে হস্তক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটে। অথচ কিনা সে সব কাণ্ড ঘটে জনগনের অধিকার সচেতন সাধারণ শিক্ষিত, চাকরিজীবী, প্রশাসনিক দায়িত্বশীল ভোটকর্মীর সামনে। তখন একটা কাজের দায়িত্বের প্রতি নৈতিক দায় ভোটকর্মীরা ভুলে যাবে কীভাবে? এবং উপস্থিত সাধারণ ভোটারের প্রত্যেকের মনে ভোটদানের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হতে দেবেই বা কেন? ফলে নিরপক্ষ কাজের দায়িত্ব থাকা ভোটকর্মীর বেলায় ক্ষেত্র বিশেষে যা জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এ দেশের পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে পূর্ববর্তী বিভিন্ন নির্বাচনে এমন ঘটনার পরিসংখ্যান নেই, এমন কথা নিশ্চয়ই বলা যায় না।

দেশের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন দরজায়। তথ্য বলছে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৯০ কোটি, যার মধ্যে সদ্য নতুন ভোটার প্রায় দেড় কোটি। নির্বাচন কমিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সব বুথে ভিভিপ্যাট ব্যবহার করা হবে। থাকবে ইভিএম-এ প্রার্থীদের ছবিও। মোট পোলিং বুথের সংখ্যা দশ লক্ষাধিক। কেন্দ্রীয় ও প্রতিটি রাজ্যস্তরের নির্বাচন কমিশন এ দেশে সাংবিধানিক ভাবে বহাল। অবশ্য কিছু রাজ্যস্তরের ভোটে রাজ্য নির্বাচন কমিশনই ভোট পরিচালনার মূল দায়িত্বে থাকেন। আর সম্পূর্ণ ভোট পর্ব পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নানা স্তরের সরকারি কর্মচারীদের ভোটের কাজে সাময়িক ভাবে বহাল করেন, এবারের লোকসভা ভোটে এই ভোটকর্মীর সংখ্যা মোটামুটি চল্লিশ লক্ষের ও বেশি। কতগুলি সুনির্দিষ্ট দিনে ভোটগ্রহণ-প্রশিক্ষণও হয়। এরপর যথা নির্দিষ্ট ভোটগ্রহণের দিন গুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে পৌঁছে যান পূর্ব প্রশিক্ষিত ভোটকর্মীরা জনগনের রায় সংগ্রহে। মুখে মুখে কাজটি খুবই পরিচিত, সুপরিচালিত এবং নির্ভরযোগ্য– অনেকের মতে নিতান্ত সহজ ও সরল। সরকারি কর্মচারীদের অবশ্য এই ভোট গ্রহণের কাজে একটা নির্দিষ্ট অর্থ ভাতা হিসাবে দেওয়াও হয়। তাহলে আর সমস্যা কী? যান সুস্থ ও শান্তিতে ভোট নিয়ে আসুন– এভাবেই ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার থেকে বলা হয়েও থাকে। কিন্তু ভয় কি তাতে কাটে? বরং রক্তচাপ বাড়ে, কমে না।

কিন্তু কেন এই ভয়? কেন হাজার হাজার সরকারি কর্মচারী থেকে স্কুলের শিক্ষকদের ভোটের ডিউটিতে এতো আতঙ্ক? এটা কি নিছকই অলসতা, নাকি সত্যিই এর কার্য-কারণ সম্পর্ক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দরকার আছে! সাধারণ শিক্ষিত নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এই সব ভোটকর্মী। যাদের সিংহভাগ শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অমান্য করার অপরাধ এড়াতে এক বুক আতঙ্ক নিয়ে হাজির হন ভোটগ্রহণের কাজে। কিন্তু সে তো কাজের প্রতি অনীহা নয়, বরং সবচেয়ে বড় ভয় হলো অপমান, মানসিক ও শারীরিক উভয়েরই। অর্থাত্ পরিস্কার অর্থে ভরসা ও নিরাপত্তার। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ছবিটা যে একটুও আলাদা তা নয়, বাঙালি হিসেবে এ রাজ্যের সদ্য পেরিয়ে আসা পঞ্চায়েত ভোটের বাস্তব অভিজ্ঞতা কোনওভাবেই একজন সাধারণ ছাপোষা সরকারি কর্মচারীকে ভোটগ্রহণের কাজে অংশ নিতে সম্পূর্ণ নির্ভয়তা দান করে না। ভয় বা আতঙ্কের ঘটনা হয়তো সব ভোটকেন্দ্রে ঘটে না, কিন্তু যে ক’টি জায়গায় ঘটেছে তা যে আবার কোথাও ঘটবে না, তা কে বলতে পারে? নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ, প্রশাসনিক আধিকারিক প্রত্যেকেই এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার মতো প্রতিক্রিয়ায় অভ্যস্ত। ফলে ভীতি ও আতঙ্কের ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটছে না। অনেকেই ভোটের ডিউটিতে যেতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছেন।

অনেকে বলছেন আধা সেনা বা কেন্দ্রীয় বাহিনী এর একমাত্র সমাধান। কিন্তু শুধু কি তাই? রাজনৈতিক দলগুলো, তাদের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন? তাদের কি কোনও নৈতিক দায়বদ্ধতা প্রত্যাশা করবে না প্রতিটি ভোটকর্মী! যারা জনগনের নিরপেক্ষ ভোটদান প্রক্রিয়ার দায় কাঁধে তুলে নেন, তাদের প্রত্যাশা মতো শান্তিপূর্ণ সুস্থ নির্ভয় পরিবেশ রক্ষার দায় তবে কাদের? প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সাধারণ সদস্য, প্রতিনিধিরা এই দায়বদ্ধতা নিয়ে সদর্থক ভাবে প্রতিটি বুথ পরিচালনায় এগিয়ে আসবেন– কেন এমনই নির্দেশ প্রত্যেক রাজনৈতিক দল তৃণমূলস্তরে কর্মীদের কাছে পৌঁছে দেন না? কেন এই সদর্থক পদক্ষেপের ব্যাপারে পার্টিগুলোর সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ থাকবে না? আর নির্বাচন কমিশন কিন্তু প্রত্যেক ভোটারের ভোট দেবার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি প্রত্যেক ভোটকর্মীর নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়ে শৈথিল্য দেখাতে পারেন না। কমিশনের মনে রাখা উচিত, সার্বিক ভাবে প্রতিটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার আসল ফিল্ডওয়ার্কার হলন এই ভোটকর্মীরাই। তাই নির্বাচন সুষ্ঠু হলো কি না, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সফল হলো কি না– সংশ্লিষ্ট ভোটকর্মীদের শঙ্কাহীনতা ও ঝঞ্ঝাট মুক্ত তা তার অন্যতম প্রমাণ। বর্তমান সংসদীয় নির্বাচনে যদি এইটুকু আশ্বস্ত না হতে পারা যায়, তবে আর বৃহত্তর গণতন্ত্রের অবশিষ্ট রইল কী! বিশেষ করে এবারের ভোটের সাতটি দফার প্রথম দফা ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু তার যতটুকু চিত্র মিডিয়ার বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা দেখতে পেয়েছি বা পাচ্ছি– তাকে পুরোপুরি অবাধ ও শাস্তিপূর্ণ বলার কোনও অবকাশ নেই। ফলে ভোট প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ ভোটকর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্নটা যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে যাচ্ছে। সুতরাং প্রস্তাব উঠতেই পারে, প্রয়োজনে বিকল্প ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনই ভাবনাচিন্তা শুরু করা উচিত।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *