কিছু কবি-সাহিত্যিক পুরস্কারের লোভে রাজনৈতিক দলগুলিকে তোষামোদ করতে চায়: বিকাশ সরকার

তখন ক্লাস এইট। তেরো-চোদ্দো বছরের একটা ছেলে জীবনের তাগিদে জীবিকার তাগিদে বেড়িয়ে পড়ল ‘ভাত শিকারে’। সেই থেকে শুরু হল টিকে থাকার দাবা খেলা। সামনে পথ রুক্ষ, কঠিন। জীবন কুয়াশাবৃত। লক্ষ্য অতিদূর এক লাল নক্ষত্র। তার চলা যত এগিয়েছে, ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে পথ। কঠিন হয়েছে লড়াই। কখনও করেছেন জঙ্গলে দিনমজুরী, কখনও প্রেসে কম্পোজিং আবার কখনও দেওয়াল লিখেছেন, সেই কিশোর। লড়াই যত কঠিন হয়েছে, ততই তিনি আঁকড়ে ধরেছেন কলম। তাঁর কথায়, খুব বেশি হলে আমার একটা ট্যাক্সি ড্রাইভার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা তো হইনি। আমি একটা দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। হ্যাঁ ইনি বিকাশ সরকার। একান্ত সাক্ষাতকারে মুখোমুখি হয়েছিলেন ‘যুগশঙ্খ ডিজিটাল’-এর সঙ্গে।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: আপনার লোখালিখির সূত্রপাত কীভাবে?

বিকাশ সরকার: আমার লেখা-লিখির সূত্রপাত হল বাবার হাত ধরে। আমার বাবা একসময় লিখতেন। আমার ছোটকাকাও লিখতেন। বাবা আর কাকার প্রায় তিন হাজারের মতো বইয়ের কালেকশন ছিল। ছোটবেলা থেকে সেগুলো পড়েছি। তখন থেকেই লেখার প্রতি একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তারপর ১৯৭৮ সালে আমি আমার প্রথম লেখাটা লিখি। ‘লাল নক্ষত্র’ নামে একটা পত্রিকায় সেটা ছাপা হয়েছিল। কিন্তু আমার প্রকৃত লেখালিখির শুরু ‘দেশ’ পত্রিকা থেকে। ১৯৮৩ সালে। যখন আমি ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। সেই সময় ‘দেশ’ পত্রিকায় আমার প্রথম কবিতা বেরোয়, ‘চিঠি পোড়ানো উতসব’। সেটাই হল আমার প্রকৃত লেখালিখির সূত্রপাত।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: আপনার ছোটবেলা সম্বন্ধে যদি কিছু বলেন…

বিকাশ সরকার: আমার ছোটবেলা বলতে তেমন কিছু নেই। মানে ছোটবেলা বলতে যেটা বোঝায় সেই শৈশব, কৈশোর; আনন্দ-উচ্ছ্বলতা, হই হই করে কাটানো, আমার ছোটবেলা তেমন করে কাটেনি। আমাদের পারিবারিক অবস্থা তো খুব খারাপ ছিল। ১৯৭৮ সাল যখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি তখন থেকেই আমার পড়াশোনার খরচ, আমার বেঁচে থাকার যাবতীয় খরচ আমাকে নিজেকে বহন করতে হয়েছে। তারজন্য আমাকে নানা ধরণের কাজকর্ম করতে হয়েছে। যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন কত আর বয়স আমার ১৩-১৪ বছর। তখন থেকে আমাকে জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়েছে।

কারণ সেই সময় আমার বাবা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যে আমার দ্বারা আর তোমার খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। এরপরে তুমি যদি কিছু পড়তে চাও, করতে চাও সেটা তোমাকে নিজের দায়িত্বে করতে হবে। ফলে সেই ছোটবেলাকে উপভোগ করার ব্যাপারগুলো আমার হয়নি। সেই সময় বিভিন্ন ধরনের কাজ আমাকে করতে হয়েছে। যেমন জঙ্গলে দিন মজুরি করা, দেওয়াল লেখা, লিনো কেটে প্যাকেজিংয়ের ব্লক তৈরি করা, সংবাদপত্রে কার্টুন আঁকা, প্রেসে বই বাঁধাই, কম্পোজ-এর মতো বিচিত্র সব কাজ করে আমাকে টিকে থাকতে হয়েছে। ফলে ছোটবেলা বলতে যেটা বোঝায় সেটা আমার নেই।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: ‘১৩-ই জানুয়ারি’ কবিতার প্রথম স্তবকের শেষ লাইন, ‘গানেরা উড়ছে কচি কচি আজ অপেক্ষা উড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে’- এই অপেক্ষা কী বিশেষ কারও জন্য?

বিকাশ সরকার: ‘১৩-ই জানুয়ারি’ কবিতা আমার এক অদ্ভুত ভালো লাগার জায়গা থেকে লেখা। ‘১৩-ই জানুয়ারি’ আমার জীবনে খুব আনন্দের একটা দিন। কেন, কী আনন্দ সেটা আমি বলব না। কবিতাতেও কোথাও লিখিওনি। কিন্তু একটা ব্যক্তিগত আনন্দের অনুভূতি সেখানে আছে। ওই যেমন কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে না, যে সম্পর্কগুলো একটা আদল পায় না। সেই আদল না পাওয়া, চেহারা তৈরি  না হওয়া সম্পর্ক তো কিছু কিছু থাকে। সেই দিনগুলো মনে পড়লে একটা খুব আনন্দের অনুভূতি হয়। মনে হয় একটা ভালো লাগার মধ্যে ছিলাম। এমন কিছু ভালো লাগার জায়গা আছে, যা আমাকে নির্দিষ্ট করে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য লিখতে বাধ্য করেছে।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: কবি-সাহিত্যিকরা সাহিত্য জগত নিয়ে পলিটিক্স করছেন সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে। এই বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

বিকাশ সরকার: এখন সোশ্যাল মিডিয়ার পলিটিক্সের ব্যাপারটা খুব সহজ হয়ে গেছে। আগে লিটল ম্যাগাজিন ছাড়া কারও গতি ছিল না। কারণ বড় বড় পত্রিকাগুলো তো আর খুব বেশি লেখা ছাপবে না। ‘দেশ’ বা দেশের সমতুল্য কোনও বাণিজ্যিক পত্রিকা হয়তো সারা বছরে দু-তিনটে লেখা ছাপতে পারে। ফলে আমাদের লিটল ম্যাগাজিনের ওপর একটা নির্ভরতা ছিল। প্যারালাল বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোর সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিনগুলোও চলত। এখন সেটা আর নেই। এখন একটা কবিতা লিখে কেউ ফেসবুকে দিয়ে দিল। কেউ একটা ব্লগে দিয়ে দিল। সেগুলো অনেকে পড়ল। কিন্তু মজার ব্যাপার হল এই যে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে লক্ষ্য লক্ষ্য পাঠক পড়ছে এরা কী প্রকৃত পাঠক, এটা নিয়ে আমার একটা সন্দেহ আছে। যাঁরা একটা কবিতা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিন হাজার লাইক, সাতশটা কমেন্ট পায় তাঁরা কি প্রকৃত লেখক বা যাঁরা পড়ছে এরা কি প্রকৃত পাঠক? লিটল ম্যাগাজিন যে তিনশ-চারশ কপি ছাপা হতো সে পত্রিকাগুলো কারা কিনতো বা কারা পড়ত। মনে করো তিনশ কপি পত্রিকা ছাপা হল, দুশো কপি আমরা পুশ সেল করতাম। সেখান থেকে হয়তো দেখা গেল পঁচিশজন প্রকৃত পাঠক আছে। যাঁরা সাহিত্যকে সত্যিকারের ভালোবাসে, তারা অবশ্যই পত্রিকাটা কিনেছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকৃত পাঠক কে, সেটা জানতে পারা যায় না। আর কয়েকটা লাইক-কমেন্ট নিয়েই পারস্পারিক বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা তৈরি হচ্ছে। এবং তার ফলেই পলিটিক্সের বাজারটা বেশ রমরমা হয়ে উঠেছে। সত্যি খুব নোংরা রাজনীতি চলছে। এবং আমার মনে হয় এই জিনিসটা যদি বন্ধ না হয় তাহলে বাংলা সাহিত্য আরও খারাপের দিকে যাবে। আর এমনিতেও বাংলা সাহিত্য তলানির দিকে। মানে অবস্থা খুবই খারাপ।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: আপনার কি মনে হয়, পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘লবি’র দরকার?

বিকাশ সরকার: ভীষণ দরকার। লবি না থাকলে এখন পুরস্কার পাওয়াই যায় না। এখন পুরস্কারের খুব রমরমা তৈরি হয়েছে। আগে এত পুরস্কার ছিল না। পুরস্কার বলতে আগে আমরা বুঝতাম সাহিত্য অ্যাকাডেমি, আনন্দ পুরস্কার আর বাংলা অ্যাকাডেমি পুরস্কার। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে ভুরি ভুরি পুরস্কার তৈরি হয়েছে। আর সে সমস্ত পুরস্কার যাঁরা পাচ্ছে তাঁদের দেখলে অবাক লাগে। তাঁরা কোথায় লিখেছ, কী লিখেছ, কবে লিখল, আর কেন পুরস্কার পাচ্ছে? আমি যেমন প্রচুর তরুণ লেখক থেকে নবীন লেখকদের লেখা পড়ি, তাছাড়া সংবাদপত্রে চাকরি করার সুবাদেও তো প্রচুর লেখা পড়তে হয়। এর বাইরেও আমি প্রচুর লিটল ম্যাগাজিন পড়ি।

কখনও কখনও আমি দেখি, এমন কেউ পুরস্কার পাচ্ছে যাঁর লেখা আমি কোথাও পড়িনি। তার নামটাও শুনিনি। এটা যে কী করে সম্ভব হয়! তখনই মাথায় আসে যে নিশ্চিত যাঁরা পুরস্কারটা দিচ্ছে তাঁদের সঙ্গে যে পুরস্কারটা পাচ্ছে তাঁর খুব সুসম্পর্ক আছে। তাছাড়া সে পুরস্কার পেতে পারে না। যেটাকে তুমি বলছ লবি বাজি। লবি বাজিটা মারাত্মক বেড়ে গেছে। এখন বাংলা সাহিত্যে কিছু দাদা তৈরি হয়েছে। সেই সব দাদাদের দখলে আছে এইসব পুরস্কার। সেই দাদাদের চারপাশে যারা সারাক্ষণ ঘুরে ঘুরে বেড়ায় এদের মধ্যেই বেছে বেছে তারা পুরস্কারটা দেয়। সেই দাদাদের সঙ্গে সুম্পর্ক রাখতে না পারলে তুমি ব্রাত্য। আমার যেমন কোনও দাদার সঙ্গে সু-সম্পর্ক নেই সুতরাং কোন পুরস্কারের ক্ষেত্রে আমার নাম বিবেচনা করা হবে না কোনও দিনই।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: দাদার প্রসঙ্গ যখন এলই সেখান থেকে আমার প্রশ্ন, রাজনৈতিক দলগুলো কবি-সাহিত্যকদের বিভিন্নভাবে ব্যবহার করছে। এ বিষয়ে আপনার কী মত?

বিকাশ সরকার: ‘ব্যবহার করছে’ না বলে, বলা ভালো ‘ব্যবহার হচ্ছি’। কিছু কিছু আছে যাঁরা পুরস্কারের লোভে, রাতারাতি নাম করার লোভে রাজনৈতিক দলগুলিকে তোষামোদ করতে চায়, তারা নিজেরাই ব্যবহৃত হতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহার করে না। হিন্দিতে একটা কথা আছে, ‘আ বেল মুঝে মার’ এটার মানে হল ষাঁড় আয় আমাকে এসে গুঁতো দে। আমি যদি ষাঁড়ের সামনে গিয়ে এটা বলি তাহলে ষাঁড় তো আমাকে গুঁতোবেই। আমি যদি ব্যবহৃত হতে না চাই, পৃথিবীর কেউ আমাকে ব্যবহার করতে পারবে না। কোনও ব্যক্তির ক্ষমতা নেই, কোনও রাষ্ট্রের ক্ষমতা নেই, কোনও রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা নেই। কিন্তু রাজনৈতিক দলের সামনে ঘুরঘুর করে যাঁরা, তাঁদের রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহার করে। করবেই। তাঁদের উদ্দেশ্যই তো তাই। এর কারণ সরকারি পুরস্কার আছে, আর্থিক ব্যাপার আছে। তুমি একটা উঁচু পদ পেলে তোমার আর্থিক উপার্জনও তো অনেক বেড়ে গেল না। তাছাড়া অন্যান্য সুবিধাগুলোও তো পাওয়া যায়। যেটা এমএলএ বা এমপি-রা পায়। তাদের কি শুধু বেতনে চলে? তেমনি যে কবি-সাহিত্যিকরা এই ধরনের রাজনৈতিক দলগুলোকে তোষামোদ করে চলে, তাদেরও অনেক উপার্জন থাকে। আর্থিক ব্যাপারটাকেও তো উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। সুতরাং আমি ব্যবহৃত যদি হতে চাই আমাকে ব্যবহার করা হবে। যদি না চাই কেউ করতে পারবে না।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: কখনও কি মনে হয় অনেক কিছু পাওয়ার ছিল পাওয়া হল না। সেখান থেকে কোনও হতাশা…

বিকাশ সরকার: হতাশা তো একটা থাকেই। এখন আমার ৫৪ বছর বয়স হয়ে গেল। এখন আর সেরকম লিখতেও পারি না। তাছাড়া, আমাকে তো সারাজীবন খুব লড়াই করতে হয়েছে। আমাকে এমন এমন কাজ করতে হয়েছে যেগুলো অনেকের ভাবনারও অতীত। সেখান থেকে আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যা পেয়েছি, অনেক পেয়েছি। কারণ আমার যে পারিবারিক অবস্থা ছিল তাতে আমার একটা বাসের খালাসি হওয়ার কথা ছিল। বা খুব বেশি হলে একজন ট্যাক্সির ড্রাইভার। সেটা তো আমি হইনি। আজকে আমি একটা দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত আছি। আমার দু-চারটে বই বেরিয়েছে। আমার দু-চারজন অনুরাগী পাঠক তৈরি হয়েছে। যতটুকু হয়েছে এতে আমি খুশি। আবার কিছু কিছু সময় মনে হয় যাঁরা পুরস্কৃত হচ্ছে তাঁদের নাম জানি না, কবে লিখল, কি লিখল জানি না। তখন আমার ভেতরে একটা হতাশা হয়। তাহলে কী আমি জীবনে কিছুই লিখতে পারিনি? আমার কি কোনও পুরস্কার পাওয়ার ক্ষমতা নেই? এটাও মাঝে মাঝে আমার মধ্যে তৈরি হয়।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: সেই অর্থে তেমন কোনও বড় পুরস্কার পেলেন না। কী মনে হয় কোনও দাদার হাত ধরতে পারলেন না বলেই?

বিকাশ সরকার: হ্যাঁ, সে তো বটেই। আমি তো আমার সারা জীবনে কোনও দাদার হাত ধরতে পারিনি। কারণ দাদার হাত ধরতে গেলেও একটা যোগ্যতার দরকার। আমার সে যোগ্যতা ছিল না। কারণ খুব বেশি পড়াশোনা আমার জীবেন হয়নি। আমি একটা দিনমজুরের ছেলে। আমার সামাজিক স্ট্যাটাসও ছিল না যে আমি কোনও দাদার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারি। তৈল মর্দনের যোগ্যতা আমার ছিল না। সুতরাং আর কী করা যাবে। এখন আর ওসব নিয়ে ভাবি না।

যুগশঙ্খ ডিজিটাল: আজকে যাঁরা নতুন লিখছে তাঁদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?

বিকাশ সরকার: তাঁদের উদ্দেশ্যে আমার একটাই কথা রক্ত মাংসের মানুষ হতে হবে। রোবট হয়ে কোনও লাভ নেই। আমরা রোবটের কাছ থেকে কোনও কবিতা চাই না, আমরা মানুষের কবিতা চাই।

কথা বলেছেন: সোমনাথ আদক

Spread the love

2 comments on “কিছু কবি-সাহিত্যিক পুরস্কারের লোভে রাজনৈতিক দলগুলিকে তোষামোদ করতে চায়: বিকাশ সরকার

  1. বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

    পড়লাম বিকাশদা । খুব ভালো লাগল । কতদিন কথা হয়নি।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *